বিয়ের দু একদিনের মাঝে আমি এটা বুঝে গেছি যে, আমার জনাবের ভীষণ রাগ। সবাই তাকে শ্রদ্ধা করে। আর আমি? ভয় পেতে শুরু করলাম। যেদিন আমায় ওরা দেখতে এসেছিলো সেদিন, শ্বশুর শাশুড়ি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছিলেন। কিন্তু যে লোকটা বিয়ে করবে, সে একবারও চোখ তুলে তাকালো না। তার উপরে মোটা ফ্রেমের গোল চশমা পড়ে চেহারাটা আতেল মার্কা বানিয়ে রেখেছে। আংটি পড়াতে এসেও জনাব আতেল আমার দিকে একবারের জন্যেও তাকাচ্ছিলোনা। আমিই আড় চোখে দেখছিলাম আর মনে মনে খুব অনুরোধ করলাম- "জনাব আতেল আমাকে একবার তাকিয়ে দেখুন,কত্ত সুন্দর আমি।" কিন্তু সবাই কি মনের কথা বোঝে। বারো হাজার টাকা খরচ করে পার্লার থেকে বউ সেজেছি কিন্তু লাভ কি? যার জন্যে সাজলাম সেই তো দেখেনা। খুব রাগ হচ্ছিলো আমার। সবাই যখন নতুন বউ বরণে ব্যস্ত, তখন আমি বেলি ফুলের গাছ খুজছিলাম উঠনে। ইচ্ছে ছিলো, যে বাসায় বউ হয়ে যাবো সে বাসায় বেলি ফুল চাই-ই চাই। কিন্তু নাহ পাইনি ????। আমার আতেল জামাই বাসর রাতে নাক ডেকে ঘুমিয়েছেন। সে নাকি ক্লান্ত ছিলো। আমি ভেবেছিলাম সারা রাত গল্প করে কাটাবো অথচ সেদিন কেন? কোন দিনই আমি তার সাথে গল্প করতে পারিনি। স্বামী স্ত্রীর যেমন সম্পর্ক হয়, তার থেকে শিথিল ছিলো আমাদের সম্পর্কটা। যে আমি আংটি বদলের পর,মোটা ফ্রেমের চশমা পড়া আতেলটার প্রেমে পরে গিয়েছিলাম, আর রোমান্টিক গানের সাথে আতেলের গুরুগম্ভীর অবয়ব টাকে ভেবে ঠোট কামড়াতাম, সেই আমিই রোমান্টিক বহির্ভূত হয়ে গেলাম। আমার কপালে আদর সোহাগ মাখা প্রেম নেই মেনে নিয়েই, যান্ত্রিক সংসার শুরু করলাম। ও হ্যাঁ বলতে ভুলেই গেছিলাম, আমার আতেলটার নাম জয়।সে খুবই কম কথা বলে।প্রয়োজনের বাহিরে একটা শব্দও যেন তার ওষ্ঠ ছোঁয় না। বান্ধবীদের হানিমুন , রোমান্টিকতা আর খুনসুটির সংসারের সাথে আমার টা মেলাতাম। খুব কষ্ট হতো তখন। জয় যে আমাকে ভালোবাসেনা বুঝতে পারতাম। অদ্ভুত রকমের একটা সম্পর্কে জড়িয়েছি। আমার স্বামী অথচ কোন টান নেই আমার প্রতি। শখ করেও সে কখনো আমার নাম ধরে ডাকেনা। কখনো বলেনা চলো কোথাও ঘুড়তে যাই। কিন্তু এই নিরস লোকটার উপরে আমার মায়া পরে গেছিলো। রাতে তার জন্যে না খেয়ে বসে থাকতাম, অথচ সে এসে খেয়ে চলে যায়, একটা বার প্রশ্ন করে না,তুমি খেয়েছো? বিয়ের দেড় বছর এভাবেই কেটে গেল। নিরস,নির্জীব। শুধু দায়িত্ব আর কর্তব্যভার এর বাহিরে যেন কেউ নেই,কিছু নেই। একদিন সাহস করে শাশুড়ি মাকে প্রশ্ন করলাম -"মা আপনারা কি জয়ের ইচ্ছের বিরুদ্ধে আমার সাথে ওর বিয়ে দিয়েছেন?" শাশুড়ি এক চোট হেসে বললেন -"আমার ছেলেটা এমনই মা, এর জন্যে ওকে ভুল বুঝিস না।" সংসার জীবণে আমি সুখি হতে পারছিলাম না। ভীষণ বিরক্ত লাগতো। যে আমার বিয়ে নিয়ে কত স্বপ্ন ছিলো। হানিমুন,স্বামীর সাথে খুনসুটি, আইস্ক্রিম ভাগাভাগি করে খাওয়া,চাঁদ দেখা,জেদ করা,আহ্লাদীপনা। কোন কিছুই পূরণ হলোনা। ফেসবুকে যখন বিভিন্ন দম্পতির যুগল ছবি দেখতাম, আপন মনেই দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসতো। হঠাৎ একদিন জয় কয়েক টা বেলি ফুলের চারা এনে উঠনে লাগিয়ে দিলো। প্রথমে খুব খুশি হয়েছিলাম।ভেবেছি আমার জন্যেই লাগিয়েছে, কিন্তু পরে মনে পরলো, সে তো জানেই না আমি বেলি ফুল ভালোবাসি। সারাদিন একা একা সময় কাটতো না, তাই ছোট বোন বিন্দুর কাছ থেকে বই এনেছিলাম।সমরেশ মজুমদারের। কিছুদিন আগে,সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি, বেলকনিতে একটা বেতের দোলনা আর পেন্ডুলাম লাগিয়েছে জয়। দোলনার উপরে সমরেশ মজুমদারের ডজন খানেক বই। সেদিন প্রথম এতটা আনন্দ হচ্ছিলো। রাতে জয়কে বললাম-ধন্যবাদ। এটা শুনে যেন সে, আকাশ থেকে পরলো। যা বুঝিয়ে দিলো তা হচ্ছে- ওর প্রিয় লেখক সমরেশ মজুমদার, আর কিছুদিন পরেই ওর অফিস থেকে ঈদের ছুটি দেবে, এই সময় টাতে সে এই বইগুলো পড়েই কাটাবে। অপমানে কান্না পাচ্ছিলো আমার, না আমার জন্যে বই আনেনি এটা ভেবে নয়। বরং ঈদের ছুটিটা সে বই পড়ে কাটাবে ভেবে। কিন্তু আমি সেদিনেও চুপ ছিলাম। এই দেড়-দু বছরে আমি মাত্র দুবার বাবার বাড়ি গিয়েছিলাম। যেতে ইচ্ছে করতো না এ লোকটাকে ছেড়ে অথচ দিনকে দিন তাকে অসহ্য লাগতে লাগলো। বিছানাতেও আমি নিজেকে গুটিয়ে নিলাম। সেও বোধহয় অপমান বোধেই আর জোড় করেনি। বই গুলো বুক সেলফের তাকেই পড়ে থেকে ধূলি জমতে শুরু করলো, তবুও আমি ছুঁয়ে দেখিনি আর নাইবা জয় ছুঁয়েছে। আমি নিজেকে পুরোপুরি গুটিয়ে নিয়েছিলাম। মাকে ফোন করে ভীষণ রকম কেঁদেছি। বড় ভাই আর বাবা জয়ের উপরে রেগে গিয়েই আমায় বললো -" তুই ও বাড়ি ছেড়ে চলে আয়।" আমি সেদিনই ব্যাগ গুছিয়ে শ্বশুর আর শাশুড়ি মাকে জানালাম। ওনারা বারবার নিষেধ করলেও জয় বলে উঠলো- "ও যেতে চাইলে যাক মা।" শুধু তাই না, জয় আমার সাথে করেই আসছিলো বাড়ি পৌঁছে দিতে। যেন অপেক্ষারত ছিলো, কবে আমি বাড়ি ছেড়ে চলে যাবো। পুরো রাস্তা একটা কথাও বলিনি তার সাথে। আর সে তো বরাবরই চুপ। বাস থেকে নেমে অল্প একটু পথ নদী পারাপার করতে হয়, আমার বাসা যেতে। আমি নৌকার কোণায় গিয়ে বসে পড়লাম, আর জয় আমার থেকে একটু দূরে। হঠাৎ মাঝ নদীতে, ভারসাম্য হারিয়ে আমি কিভাবে যেন উল্টে পড়ে গেলাম। কিছু বোঝার আগেই এই কনকনে শীতে আতেলটাও লাফ দিলো। মজার বিষয় হচ্ছে, সে সাতার জানতোনা।ডুবে যাবার উপক্রম। আমিই কোনরকম তাকে টেনে তুলেছি। হাসি পাচ্ছিলো আমার। বাড়িতে এসে দুদিন ছিলাম। দুটোদিনই আতেলটা আমার অসুস্থ ছিলো।জ্বরের ঘোড়ে বলছিলো - "বিনি,তোমাকে আমি ডুবতে দেবনা।" আমি পরে জয়ের সাথেই শ্বশুর বাসায় ফিরে যাই। আর কখনো আমার সংসারটাকে নির্জীব লাগেনি। আসলে সবার ভালোবাসার ধরণ একরকম হয়না। জয় কখনো আমায় নিয়ে চাঁদ দেখতে চায়নি ঠিকই, কিন্তু আমিও তো চাইনি। এখন আমরা চাঁদ দেখি,জোৎস্না দেখি।আমিই আতেলটার জন্যে আইসক্রিম আনি। বৃষ্টিতে ভিজি জোড় করে। আসলে আমার আতেলটা একটু এমনই।
লেবেল
- জীবনের গল্প (2)
- ভুতের গল্প (2)
- রম্য গল্প (1)
- রূপচর্চা (1)
0 Comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন